গুলিবিদ্ধ শরীফ ওসমান হাদির ওপর নৃশংস হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়কের আরোগ্য কামনায় দেশজুড়ে সাধারণ মানুষ প্রার্থনা জানালেও, এই ন্যক্কারজনক হামলা নিয়ে তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক এবং টক-শো আলোচকদের একাংশের ভূমিকা জনমনে গভীর অসন্তোষের সৃষ্টি করেছে। সামাজিক মাধ্যমে কুখ্যাত এই সুশীলরা খুনি হাসিনার ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার চিহ্নিত দোসর হিসেবে পরিচিত।
 |
| উল্টো জুলাই বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ছড়াচ্ছে বিদ্বেষ, হত্যায় প্ররোচনা |
হাদির জন্য গোটা দেশ কাঁদলেও নিশ্চুপ কেন কথিত সেই বুদ্ধিজীবীরাঅভিযোগ উঠেছে, সাংস্কৃতিক ফ্যাসিস্টরা জুলাই বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন, ফ্যাসিবাদি বয়ানের মধ্যদিয়ে তাদের হত্যাযোগ্য করে তুলছেন। এমনকি হাদির বর্বরোচিত হত্যাচেষ্টার ঘটনাকে প্রকারান্তরে ‘উৎসব’ হিসেবে পালন করতে দেখা গেছে নির্লজ্জ এই দেশবিরোধীদের। গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ্যে বিদ্বেষ ছড়ানোর পরও হাসিনার দোসরদের আইনের আওতায় না আনায় সরকার ও প্রশাসনের প্রতি চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন দেশপ্রেমিক জনতা।
হাদিকে গুলি করার পর সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন সাংবাদিক ও টক-শো ব্যক্তিত্ব আনিস আলমগীর, যিনি গণহত্যাকারী হাসিনার ঘনিষ্ঠ দোসর হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অভিযোগ, তিনি লাহোরি নেহারি খাওয়ার ভিডিও পোস্ট করে হাদির ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনাকে সেলিব্রেট করেছেন। এছাড়াও গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভুতি প্রকাশকারী মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আবদুন নুর তুষার, সাংবাদিক মাকসুদ কামাল, পান্না, নিকোলা ও অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনসহ চিহ্নিত সাংস্কৃতিক ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুসছেন নেট দুনিয়ার বাসিন্দারা।
নেটিজেনরা বলছেন, হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আনিস আলমগীর সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে 'হাস্যকরভাবে আওয়ামী লীগকে টেনে আনা হচ্ছে' লিখে আওয়ামী লীগকে দায়মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেন। তার মতো আওয়ামী পন্থি অন্যান্য বুদ্ধিজীবীরাও এই সন্ত্রাস বা হত্যাচেষ্টাকে 'সেলিব্রেট' করছেন এবং হত্যাকারীদের উৎসাহিত করছেন। এটা তাদের মানসিক বিকারগ্রস্ততা প্রমাণ করে। আর এই ধরনের মানসিক বিকারগ্রস্ত ও জুলাই অভ্যুত্থান-বিদ্বেষীরা কিভাবে ধরাছোয়ার বাইরে রয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
সচেতন মহলের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ যখন কোনো প্রোপাগান্ডা ছড়ায়, আনিস আলমগীররা তা যাচাই ছাড়াই প্রচার করেন। কিন্তু সন্দেহভাজন হামলাকারী হিসেবে সাবেক ছাত্রলীগ নেতার নাম আসার পরও তারা ‘হাস্যকরভাবে আওয়ামী লীগকে টেনে আনা হচ্ছে’ বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন।
এছাড়া, আওয়ামী লীগের চিহ্নিত দোসররা দেশের বৃহত্তম একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মিডিয়া গ্রুপসহ একাধিক চ্যানেলে 'সফট লীগ' সেজে সরকারের সমালোচনা করার আড়ালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বুলি আওড়িয়ে হাদির মতো কর্মীদের 'রাজাকার' ট্যাগিং করে হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে, বামপন্থী নেতা-কর্মী, সুশীল সমাজ এবং '৭১-এর মুক্তিযোদ্ধা নামধারী ব্যক্তিরা—যারা সাধারণত যেকোনো হামলার প্রতিবাদে সরব হন—তারা হাদির ঘটনায় নিশ্চুপ থাকায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষুব্ধ ব্যবহারকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন, হাদির ওপর হামলার ঘন্টায় নিন্দা করে এখনও ১২১ নাগরিক, ২৫১ বুদ্ধিজীবী, ৩০১ সংস্কৃতি কর্মীর বিবৃতি পাইলাম না। পান থেকে চুন খসলেও, যারা তীব্র নিন্দা জানিয়ে দেশে উগ্রবাদের উত্থান হয়েছে শঙ্কা করে বক্তৃতা বিবৃতি দেন, হাদির ওপর হামলার পর তাঁরা নিরব কেন?
অনেকেই এসব তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের দেশের প্রধান ভাইরাস হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যারা চেতনার ব্যবসার সুযোগ না থাকায় এই হামলার ঘটনায় মুখ খোলেননি। তারা হাসিনার দোসরদের টক-শোতে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য সংশ্লিষ্ট টিভি চ্যানেলগুলোর লাইসেন্স বাতিলের আন্দোলন করার হুমকি দিয়েছেন।
জুলাই বিপ্লবীদের সমর্থক এস এম সাইফ মোস্তাফিজ এবং সাংবাদিক ইলিয়াস হোসেনের মতো ব্যক্তিরা খোলাখুলিভাবে তাদের বিরুদ্ধে 'যুদ্ধ ঘোষণা' করেছেন। তারা কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারী দিয়ে বলেছেন, ‘‘আজকে থেকে নিষিদ্ধ ফ্যাসিস্টদের সিম্প্যাথাইজার, তাদের পক্ষে বয়ান উৎপাদনকারী তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, টকশো জীবী, রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, সাংবাদিক এবং এদেরকে প্রোমট করা মিডিয়া হাউজ, পত্রিকা, স্পন্সরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছি।এখন থেকে যারা আনিস আলমগীর, আবদুন নুর তুষার, কথা কামাল, পান্না ও শাওনসহ এদের সঙ্গে টকশোতে যাবেন কিংবা একই সুরে কথা বলবেন, এদের সবাইকে বয়কট করতে হবে। জুলাইয়ের অবমাননা যারা করবে, তাদেরই আমরা মার্কেট আউট করে দেব।’’
হাদিকে গুলি করার প্রধান সন্দেহভাজন সাবেক ছাত্রলীগ নেতার জামিনের ঘটনায় বিচার বিভাগ এবং আইনজীবীদের একটি অংশের প্রতিও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কতিপয় বিচারক ও আইনজীবীদের ‘যৌথ চক্র’ টাকার বিনিময়ে 'দুর্ধর্ষ খুনিদের' গণহারে জামিন দিচ্ছে। জামিন করানোয় জড়িত বিচারক ও আইনজীবীদের নাম প্রকাশ করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানানো হয়েছে।
বর্তমানে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা জুলাই যোদ্ধা এবং এদেশের সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী ওসমান হাদির উপর হামলার ঘটনাটিকে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে যথাযথভাবে মোকাবিলায় ব্যর্থ হওয়ায় বিএনপি-জামায়াত-এনসিপির সমালোচনা করেছেন অনেকে। অভিযোগ উঠেছে, তারা আসল শত্রুকে ভুলে গিয়ে নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়িতে ব্যস্ত। ফলে হাদিদের মতো সাহসী বীর ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের জমকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এদিকে, ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম দাউদসহ অপরাধীকে প্রকাশ্যে গ্রেফতার করতে না পারাকে 'চরম ব্যর্থতা' হিসেবে অভিহিত করছেন সচেতন মহল। পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর ভেতরে লীগের 'দোসররা' বসে আছে, যারা কৌশলে অপরাধীদের আড়াল করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।